কলেজের করিডোরে
কুবের আর কপিলা। বাংলা পাঠকজগতে দুই অতিপরিচিত নাম, রসিক শিক্ষক বা বাজারপ্রচলিত গাইডবইগুলোর অনেক পছন্দেরও বটে। তবু না চিনতে পারলে ধাম শুনলে আর চেনায় আর কোন সন্দেহই থাকে না- মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'পদ্মা নদীর মাঝি'। মোটামুটি প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই উচ্চমাধ্যমিকে সহপাঠের পিঠে চেপে সবাই পদ্মাপাড়েই ঘুরছে, কুবের-কপিলার জীবন বিশ্লেষণ করে যাচ্ছে।
আমার সেসময় পদ্মাপাড়ে ঘুরতে হয় নি। নিত্যদিনের আনন্দবাজারে মাছের স্তূপ নিয়ে আসা চিরচেনা সুবল-অনন্ত কিংবা জেলেপাড়ায় ওদের অপেক্ষায় থাকা বাসন্তীদের জীবনের দিকেই উঁকি দিয়েছি আমরা, ছোট্ট শান্ত একটা নদীকে জানার চেষ্টা করেছি অদ্বৈত মল্লবর্মনের হাত ধরে, সহপাঠ ছিলো 'তিতাস একটি নদীর নাম'।
তিতাসপারের ছোট্ট শহরে বেড়ে ওঠেছি, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারী কলেজে যে 'তিতাস একটি নদীর নাম' পড়ানো হবে এ আর কী এমন আশ্চর্য! একটু দূরে সদর হাসপাতালের সামনে দাঁড়ানো 'মহিলা কলেজে' যে পদ্মা নিয়ে নাড়াচাড়া করা হতো সেটাই বরং অবাক করার মতো!
তিতাস গ্যাসের ব্রাহ্মণবাড়িয়া, মিষ্টির শহর ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সময়ের হাত ধরে আরো একটু পিছিয়ে গেলে সংস্কৃতির শহর ব্রাহ্মণবাড়িয়া, আরো পিছিয়ে গেলে বিপ্লবীর শহর ব্রাহ্মণবাড়িয়া- তবুও আপাত ছোট্ট এ শহরটায় সরকারী কলেজ বলতে সবাই ঐ ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারী কলেজ আর তার বোন ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারী মহিলা কলেজকেই চেনে।
শত বছর পুরোনো অন্নদা স্কুল থেকে সদ্য পাশ করেছি, বাসার বাইরে যাব এমন চিন্তা মাথার ত্রিসীমানার মধ্যেও নেই, মা-খালাদের মতো মহিলা কলেজে তো যাওয়া যায়না- চাই কি বাসার একদম কাছেই হোক, কাজেই নানা-মামা-খালু-খালাতো ভাইয়ের দেখানো পথ ধরে চিনে নিয়েছি রেলগেট পেরিয়ে মৌড়াইলের কাছে কলেজপাড়ার সরকারী কলেজকেই। মহানগর প্রভাতি, উপকূল এক্সপ্রেস, মহানগর গোধূলী বা সিলেট যাওয়ার পারাবত এক্সপ্রেসে যাওয়া আসার সময় চোখ অবধারিতভাবেই এখনো তিনতলা হলুদ বিল্ডিংটাকে খুঁজে নেয়, আর মন সুবর্ণ এক্সপ্রেসের গতিতে পেছনের দিনে ছোটে।
পাইকপাড়ার বাসা থেকে রিকশায় গেলে দশ মিনিটের পথ, পয়দল হলে মিনিট বিশেক, আর দল ভারী থাকলে ৩০ মিনিট ছাড়িয়ে ঘন্টা ছুঁই ছুঁই করতো সময়ের কাঁটা। অবশ্য খুব কমই একবারে যাওয়া পড়েছে কলেজে- কখনো হয়তো প্রিয় সাইকেল চেপে কুমার শীলের মোড় হয়ে নিউ সিনেমা হল রোড ধরে অতি পছন্দের মিষ্টির দোকানগুলো পেছনে ফেলে এগিয়ে গেছি, কে দাশের মোড় থেকে সুপারমার্কেটের দিকে এগিয়ে গেছি পশ্চিমে, কাঁচারীপুকুরের সামনে মেইন রোডে ওঠে প্যাডেল চালিয়েছি দক্ষিণে, কলেজের দিকে।
কখনো একদম সোজাপথ ধরেই গেছি- কুমার শীলের মোড় হয়ে সদর হাসপাতালকে হাতের বাঁয়ে আর মোড় ঘুরতেই হাতের ডানে থমকে থাকা মহিলা কলেজকে পেরিয়ে ছুটেছি নাক বরাবর, সেই কাঁচারীপুকুর, পোস্টাফিস পার হয়ে পুলের গুঁড়ির দিকে।
অন্য বিকল্প পথটার কথাও বলেই ফেলি- কুমার শীল মোড়ের খানিকটা আগে, পশ্চিমে গলিটা ধরলে হাতেয় ডানে পড়ে আরেক পুরোনো স্কুল রাম কানাই স্কুল। এ রাস্তা ধরে এগিয়ে গেলে ট্যাংকের পাড়, কালীবাড়ির সামনের গলি ধরলে একদম সোজা অন্নদা স্কুল- ছ'বছর ওখানেই কেটেছে আমার।
কলেজে যাওয়ার সময়, তাই এই দফা আবার গলি ধরে জেলপুকুরের সামনের রাস্তায় বের হয়ে ফুলবাড়িয়ায় বন্ধুর বাসার পথ ধরলাম না। এরচে বরং বামপন্থী হই, ছোট্ট পুরোনো ভাঙা মন্দির, মহিলা কলেজের হোস্টেল, কাদের ডাক্তারের চেম্বার হয়ে চলে আসি মৌলভীপাড়ার রাস্তায়, মডেল গার্লস স্কুল আর ইন্ডাস্ট্রিয়াল স্কুল পেরিয়ে পৌর মার্কেটের পাশের রাস্তা দিয়ে আবার উঠি মেইন রোডে- কাঁচারীপুকুরের হাওয়া খেয়ে পোস্টাফিসের সামনের রাস্তা দিয়ে বেরুনো না হয় স্থগিতই রইলো এ দফা।
পুলের গুঁড়ি না হয়ে শহরের এপাশ থেকে ওপাশে যাওয়া যায়না, কাজেই সব রাস্তা এখানে এসে মিলবেই। পুলের উপর থেকে মোটামুটি বাতাসে ভেসে নিচে নামতে থাকা আর উপরে উঠতে থাকা রিকশাগুলোকে পাশ কাটিয়ে একটানে নিচে নেমে নাক বরাবর চলতে থাকলে একে একে পেছনে পড়ে যেত জামেয়া ইউনুসিয়া, আশিক প্লাজা, ফারুকী মার্কেট, কালী বাড়ির মোড়।
এরপরই জেলা পরিষদ আর রেলস্টেশন যথাক্রমে হাতের বাঁয়ে আর ডানে। স্টেশন রোডে ঢুঁ দিয়ে আসার লোভটা সামলে নিতে পারলেই সামনে পরিচিত টেম্পুস্ট্যান্ড- ভাদুঘর, কাউতলী বা আরো দূর থেকে আসা টেম্পুগুলো এখানেই যাত্রী নামিয়ে যায়।
দুনিয়া দেখতে দেখতে সামনে তাকালেই চোখে পড়ে রাস্তার ওপারে ছোট্ট জলামতো জায়গাটার পরেই সোজা লম্বামতো একতলা বিল্ডিং। কলেজ? না না, এটা নিয়াজ মোহাম্মদ স্কুল- অনেক পুরোনো, সেই ব্রিটিশ আমলে গড়া, তখন নাম ছিলো জর্জ হাই স্কুল।
স্কুলের সামনে বিশাল সবুজ মাঠ, শীতের সকাল যদি হয় তবে প্রগাঢ় ধোঁয়া ছাড়া আর কিছু চোখে পড়েনা ওপাশে। তবে ঝলমলে দিন যদি হয়, কিংবা তুমুল বৃষ্টিঝরা দিন, মাঠের ওপারে দৃষ্টি পৌঁছাবে- দক্ষিণ প্রান্তে তিনতলা আই-শেপড বিল্ডিংটা নজর কাড়বেই, মাঝামাঝি ওপরে ওর পরিচয়ও জানান দিচ্ছে যে- "ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারী কলেজ, স্থাপিত-১৯৪৮"।
ইচ্ছে করলে নিয়াজ মোহাম্মদ স্কুলের ছোটো গেট দিয়ে ঢুকে মাঠ পেরিয়ে চলে যাওয়া যায় কলেজের দিকে, সে পথ ধরা বাদ থাক। বর্ষাকাল যদি হয় তাহলে সবুজ ঘাসের আড়ালে ঐ মাঠে লুকিয়ে আছে প্যাচপ্যাচে কাদা, কাপড়েল ঝুল ময়লামুক্ত রেখে কলেজ পৌঁছা দুঃসাধ্য ব্যাপার। আর যদি হয় গরমের মৌসুম, রাস্তার পাশের গাছের ছায়ায় হাঁটার আরাম ছেড়ে খামাখা কাঠফাটা রোদে পেরেশান হওয়ার মানেই তো নেই কোনো।
এরচেয়ে ভালো রেলগেট পেরিয়ে নাক বরাবর চলতে থাকা, নিয়াজ মোহাম্মদ স্কুল হাতের বাঁয়ে থেকে পেছনে পড়ে যাবে, আরেকটু এগুলে ডানে পড়বে জেলা ফুড অফিস আর লাগোয়া ছোট কিন্তু পুরনো এক মসজিদ। যেহেতু সবে কলেজে যাচ্ছি, সময়টা নিশ্চয় সকাল, মসজিদে আসার সময় এখনো হয়নি। তাই এগিয়েই যাই বরং, ছোট্ট ডোবা আর ঝালাইয়ের কাজ করার ইঞ্জিনিয়ারিং দোকানটাও হাতের ডানে থেকেই পেছনে পড়ে যাক।
এখন কিন্তু কলেজগেটের কাছে পৌঁছে গেছি, সীমানাপ্রাচীর ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা শহীদমিনারের পেছন দিয়ে চলে এসেছি একদম কলেজের মূল গেটের মুখে। দেয়ালে বসে থাকাদের কেউ পরিচিত থাকলে একটু কুশল বিনিময় করে নিলাম নাহয়, দেখে নিলাম দেয়ালে ঝোলানো খাঁচাঘেরা নোটিশ
বোর্ডটাও। যেহেতু কোন ছুটির নোটিশ নেই তার মানে কলেজ খোলা, অতএব বিশাল লোহার গেটটা ঠেলে ঢোকা যেতে পারে, দোষ নেই তাতে।
গেটে তালা লাগানো? শেকল? থাক। কাউকে ডাকাডাকি করার কিছু নেই, বড় গেটেই ছোট্ট কেঁচি গেট আছে, মাথাটা একটু নুইয়ে ঢুকে পড়লেই হলো। কেউ আটকাবেনা। নেহায়েত যদি কেউ জিজ্ঞেস করেই বসে তখন পকেটে আই ডি কার্ড আছে, চটপট দেখিয়ে দেব; ব্যস, খেল খতম! মনে কি মেয়াদ নিয়ে কোন প্রশ্ন উঠে আসছে নাকি? একদমই অনাবশ্যক চিন্তা- আই ডি আছে এই তো বেশি, মেয়াদ আবার কী চিজ?!
গেট পেরোলেই নিশ্চিতভাবেই কলকাকলী কানে আসবে। অবাক হয়ে পাখি ডাকছে ভেবে শহীদ মিনারের পাশের বিশাল গাছটার ডালে চোখ ফেলার কিছু নেই, শব্দ আসছে সামনে জটলা পাকানো ক'জনার গলা থেকে।
বলিনি বোধ হয়- আমাদের কলেজে ছেলেরা যেমন পড়ে তেমন পড়ে মেয়েরাও। এক সরকারী কলেজে ছেলেদের পাশাপাশি মেয়েরা পড়তে পারলে শহরের আরেক সরকারী কলেজে মেয়েদের পাশাপাশি কেনো ছেলেরা পড়তে পারবেনা এ প্রশ্ন যদি এসেই পড়ে মনে, আগেই বলে রাখি উত্তর জানিনে আমি।
যাহোক, ছেলেদের স্কুল থেকে আসা ছেলেরা আর মেয়েদের স্কুল থেকে আসা মেয়েরা এক হয়ে ছোট ছোট বন্ধুজট করে নিতে সময় নেয়না তেমন, স্কুলে প্রাইভেট টিউশনে পূর্বপরিচয় বেশ কাজে লাগে হঠাত্, কলরবের শব্দ তাই অস্বাভাবিক কিছু নয়।
ড্রেসের নামে নিয়মের বাড়াবাড়ি এখানে গরহাজির, তাই সাদার ঝলক যেমন চোখে লাগে তেমন লাল-নীল-সবুজ-হলুদ-কমলা-বেগুনি-আসমানিও হাজির থাকে আড়ম্বরে, এমনকি কালোও দেখা যায় কোথাও কোথাও।
তিনতলা বিল্ডিংয়ের একদম শুরুতেই নীচতলার প্রথম রুমটা ছাত্র সংসদের জন্য বরাদ্দ। ভেজানো জানালাটা দিয়ে উঁকি দিলে হয়তো চোখে পড়বে আধখাওয়া সিগারেট হাতে কারোর মুখ, হাইবেঞ্চিতে বসে সুখটান দেয়ায় ব্যস্ত। ওদিকে নজর দেয়া সমীচীন হবেনা, এরচে বরং বাকি কলেজটা নিয়ে ভাবাই শ্রেয়তর।
একপ্রান্তে এই ছাত্রসংসদ, আর এই ভবনের যেখানে শেষ ওখান থেকে একটা সিঁড়ি ওঠেছে পূর্ব দিকের পুরোন ভবনটায় ওঠার জন্য। খোপ খোপ গ্রিলে ঘেরা বারান্দা, এর পাশেই লম্বা ঘর- ছেলেদের কমন রুম। বড় বড় দুটো টেবিল একসাথে রাখা, চারপাশে আদি যুগের নকশাওয়ালা লম্বা চেয়ার। টেবিলে পেপার, ম্যাগাজিন রাখা- পড়া যেতে পারে, তবে একটু সাবধান থাকা দরকার, কনুই বা কব্জির কাছে লাল হয়ে ফুলে যেতে পারে, এ আর এমন কী? একপাশে বড় ক্যারাম বোর্ড, ঘুটি-স্ট্রাইকার-পাউডার রাখাই আছে সাজানো, খেলার ইচ্ছে থাকলেই হলো।
তাও ভালো না লাগলে জানালার পাশে দাঁড়ানো যেতে পারে। সবুজ রং করা জানালার দুটো পাট খুলে দিলে কাঠের ফ্রেমে কোনমতে আটকে থাকা রডগুলোর ফাঁক দিয়েই উড়ে আসবে দখিনা হাওয়া। পুকুরের উপরে পিলারে দাঁড়ানো মসজিদটা চোখে পড়বে, একটু কসরত করলে দক্ষিণ-পূর্ব কোনের অর্থনীতি ভবন দেখা যাবে। দৃষ্টিতে অস্পষ্ট করে হলেও ধরা পড়বে ব্যবস্থাপনা ভবন, মসজিদের পাশের মাঠ আর মাঠের ওপাশে ছেলেদের হোস্টেল।
যে সিঁড়ি দিয়ে এখানে উঠে এসেছি তার ঠিক নীচে একটা ছোট গেট, কিন্তু এখন ইট গেঁখে বন্ধ করা। ছেলেদের হোস্টেল বা ওদিককার বিভাগীয় ভবনগুলো থেকে কলেজে আসা যাওয়ার জন্যই ঐ গেট। কিন্তু ইতিহাস বলে ছাত্র সংসদে যে মান্যবরেরা বসেন তারা নিজেরা তো ঐ গেট দিয়ে আসতেনই, 'প্রয়োজনে' নিয়ে আসতেন 'শায়েস্তা করার' নানান রকমারি উপকরণ! এই ছোট্ট গেট বন্ধ হওয়ায় অনেকটা হঠাত্ করেই কমে যায় শহর তোলপাড় জাগানো সব শায়েস্তা অভিযান।
একদমই 'নিউ ফার্স্ট ইয়ার' তখন- একটা ঘটনা বলি।
ক্লাস সবে শুরু হয়েছে। লেকচার থিয়েটারে ক্লাস। ফাঁকে বলে নেই, লেকচার থিয়েটারটা ঠিক মূল ভবনের লাগোয়া। যেখানে মূল ভবনের শেষ ওখানেই এর শুরু, তবে I-শেপড থেকে L-শেপড হয়েছে কলেজটা এ লেকচার থিয়েটার থেকেই। লেকচার থিয়েটারটা এক তলা- মাঝখানে পার্টিশন বসিয়ে দুটো ক্লাসরুম করা হয়েছে। লেকচার থিয়েটারের করিডোর পেরিয়ে নতুন বিজ্ঞান ভবন, শহীদ লুত্ফর রহমানের নামে, সেই 'উন্নত জীবন', 'মহত্ জীবন' লেখা লুত্ফর রহমান। এটাও বলে রাখা দরকার বিজ্ঞান ভবনের কলাপসিবল গেট পর্যন্তই আমার দৌড়, বানিজ্যের ছাত্র বিজ্ঞানের সারথী হবে কেমন করে?!
যা বলছিলাম, ক্লাস তখন সবে শুরু হয়েছে- কয়েকদিন গেছে মাত্র। স্যার কিছু বলছেন, আমরা কেউ শুনছি, কেউ খুনসুটি করছি, কেউ অপলক তাকিয়ে আছি ডানপাশে- (সহপাঠিনীরা ওদিকেই বসে!), কেউ তাকিয়ে আছি মাঠের দিকে, কেউ ক্লাস পালানোর পাঁয়তারা করছি।
হঠাত্ বাইরে থেকে সমস্বরে হৈ হৈ শব্দ, দুম দুম বিকট শব্দ হলো বারদুয়েক, একজনের উঁচু করা হাতে রোদ পরে ঝলমল করে উঠলো একবার। অভিজ্ঞরা বুঝে নিলো যা বোঝার, অল্প সময়েই স্যার হাওয়া, ক্লাসে থাকা অন্যরাও। আমরা বেরোতে বেরোতে ওরা চলে এসেছে, খুঁজছে কাউকে, আমাদেরই একজন। অপরাধও জানা গেলো- ওদের একজন আমাদের সাথে পড়া এক মেয়েকে পছন্দ করে বসেছে (মেয়েটি অবশ্য তা জানেনা তখনো)। আমাদের ঐ ছেলেকে দেখা গেছে মেয়ের সাথে কথা বলতে, অতএব শায়েস্তা অভিযান!
যে ছেলেটি ঘটনাক্রমে নায়ক হয়ে গেছে সে বিপদসংকেত পেয়েই হোক বা বিপদ আঁচ করতে পেরেই হোক, ততক্ষণে লাপাত্তা। সুতরাং নিয়মানুযায়ী একটু চেঁচামেচি করার পর ভিলেনদল ক্লাস থেকে বেরিয়ে মাঠে টহল দেয়ার দায়িত্ব নিলো, আগের মতো দুম দুম শব্দ হলো বারদুয়েক।
ক্লাস থেকে সবাই বেরিয়ে গেছে, কিন্তু মাঠ পেরিয়ে কলেজ ছাড়ার উপায় নেই, আবার নীচ তলায় থাকাটাও নিরাপদ না। আমরা সবাই মূল ভবনের করিডোর হয়ে মাঝামাঝি পৌঁছে দোতালার সিঁড়ি ধরলাম, দোতালায় এক মেরুতে অধ্যক্ষের কক্ষ আর আরেক মেরুতে শিক্ষক মিলনায়তন রেখে আমরা ভিড় করলাম লাইব্রেরির সামনে, 'নাটক' সবচেয়ে ভালো দেখা যাচ্ছে ওখান থেকেই।
ভিলেনদল তখনো মাঠে, মাঝে মাঝেই কারণ ছাড়াই এদিক ওদিক ছুটে বেড়াচ্ছে। হঠাত্ প্যাঁ প্যাঁ শোনা গেল, আমরা দোতলা থেকে দেখলাম রেলগেট পার হয়ে নীলরঙা পুলিশ পিকআপ ছুটে আসছে কলেজের দিকে, কলেজ থেকেই ওদের খবর দেয়া হয়েছে বোধ হয়। ভিলেনদল আবার সক্রিয় হলো, এবার দুম দুম প্রথমে, এরপর বুম বুম বুম। জর্দার কৌটা দিয়ে বানানো ককটেল। ধোঁয়া আর শব্দ। পশুর মতো হিংস্র চিত্কার। পুলিশ গেট পেরোতেই অবশ্য বীরত্বে কমতি দেখা গেলো, গেরিলা পদ্ধতিতে খানকয়েক ককটেল ছুটে গেলো পুলিশের দিকে। এর মধ্যেও অবশ্য পলায়নপর্ব শুরু হয়ে গেছে, শেষও হলো যথাসময়ে, এক গাড়ি পুলিশ- ওরা পালানো ঠেকাবে কী করে! কিছুক্ষণের মধ্যে মাঠ ফাঁকা, পোড়া গন্ধ আছে, পুলিশ ছাড়া মানুষ নেই। পুলিশ নিশ্চিন্ত, খুশিও। কজন কলেজেই হাঁটাহাঁটি করছে, দুজন বসা গেটের পাশে দাঁড় করানো নেভি ব্লু পিক আপে।
উপর থেকে আমরা তখন অন্য নাটক দেখছি, পালিয়েছে যারা তাদের দুয়েকজন আবার ফিরে ঘুরঘুর করছে পুলিশ পিক আপটার কাছাকাছি। কথা নেই বার্তা নেই, হঠাত্ বুমম শব্দ, বেশ জোরে, গাড়ি দেখা যাচ্ছেনা আর ধোঁয়ার চোটে, কীর্তিমানেরা এর মধ্যেই উধাও!
ধোঁয়া ফুঁড়ে বেরিয়ে আসতে দেখা গেলো দুই পুলিশপ্রবরকে, ওরা ছিলো গাড়িতেই। ঊর্ধ্বশ্বাসে গেট পেরোলো দুজন, চরম আতংকিত। সহকর্মীদের দিকে ফিরেও তাকালোনা তারা, একদৌড়ে ওঠে এলো দোতলায়, নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য! রক্ষকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে আমরা খুশি, কজনকে দেখা গেলো দাঁত বের করে হাসছে!
কী আশ্চর্য! পুলিশ বলে কি ওদের ভয় ডর থাকতে পারেনা!? এ নিয়ে অত হাসির কী আছে?!
দুরন্ত ঘটনার সাক্ষী এই লাইব্রেরির পাশেই রিডিং রুম। এ দুটো রুম সবসময়ই খালি পাওয়া যায়, ছাত্র-ছাত্রীরা ভুলেও এমুখো হয় না। পাশের রুমটায় অবশ্য ছাত্রীরা যায় নিয়মিতই, বেশ ভীড়ও থাকে ওখানে। 'ছাত্ররাও' চেষ্টা করে অবশ্য যাওয়ার, পারেনা। আশেপাশে থাকতে পারলেও ওরা খুশী কিন্তু ওই রুম থেকে বেরিয়ে আসা আয়া তা হতে দিলে তো! 'মেয়েদের কমনরুম' পাহারার দায় তো তারই সবচেয়ে বেশী।
কলেজে ঢোকার মুখে যে জটলাগুলো চোখে পড়েছিলো সেগুলো কিন্তু বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই হয় দোতলার এ ঘর বরাবর নীচের সুরকিময় লালচে চলার পথটায়, কারণটা নির্দিষ্ট করে বলা অবশ্য মুশকিলের কাজ।
এখানে একটা মজার ঘটনা দেখেছিলাম, বলেই ফেলি।
আমাদের এক বন্ধুকে আমরা আদর করে 'মৌচাক' ডাকতাম। 'মৌমাছি'রা ওকে এমন করে ঘিরে রাখতো যে আমরা কাছেই ঘেঁষতে পারতাম না। একদিন মৌচাক দাঁড়িয়ে আছে, মৌমাছিদের নিয়ে- একদম জায়গামতো। আমরা একটু দূরে দাঁড়িয়ে, মহারাজ আমাদের সাথে যোগ দিলে ক্লাসের দিকে যাওয়ার খায়েশ। কিন্তু রাজাধিরাজের মিটিংয়ের আর শেষ হয়না। হঠাত্ তাঁর নজর পড়লো দোতলার বারান্দায়, কমন রুম থেকে বেরিয়ে এক বান্ধবী আর একজনের সাথে আলাপে মেতেছে তখন। তাই দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করলেন চেষ্টা করলেন তিনি, 'দ' আদ্যক্ষরের বান্ধবীটিকে নাম ধরে ডেকে। প্রথম ডাকে মনোযোগ পাওয়া গেলো না, অতএব দ্বিতীয়বার, "এএইই, দী...!" ডাক শেষ হয়নি, চট করে কেনো জানি মুখ নামিয়ে নিলেন তিনি- দোতলার উপর দিয়ে তখন ফটফট ডানা ঝাপটে একটা কাক উড়ে যাচ্ছে, তার গলায়ও ডাক, "কা ক্বা কা!"
ঘটনা আন্দাজ করে তাড়াতাড়ি ছুটে যেতে হলো কাছে। মৌচাক তখন মৌমুক্ত, ওরা পাশে দাঁড়িয়ে কলকল করছে। বন্ধুটির অবস্থা তেমন সুবিধার না অবশ্য, বিচিত্রভাবে মুখব্যাদান করে বসে, ক্ষণে ক্ষণে জিহ্বা বের করছে কেন জানি!
অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী বন্ধুটি পরে বহুবার বলার চেষ্টা করেছে ও সেদিন মোটেও কাকের ইয়ে গেলেনি, আমরা ততবারই মনে করিয়ে দিয়েছি উপর থেকে টুপ করে পড়ে চলাত্ করে গলা পেরিয়ে যাওয়ার ক্লাসিক স্মৃতির কথা!
সুরকি বিছানো মাটির রাস্তাটা শুধু চলার পথই নয়, চড়ারও। গেট খুলে দিলে রিকশা, কলেজের বাস আর গেট বন্ধ থাকলে সাইকেল, বাইক ঢুকতে পারে এ রাস্তা মাড়াবে বলে। মূল ভবনের পাশ দিয়ে যেতে যেতে লেকচার থিয়েটার অবধি পৌঁছতে পারলেই ওদের বিশ্রামের ব্যবস্থা করা আছে- বারান্দার সামনেই সিমেন্টে গাঁথা সারি সারি গোল করা লোহার রড, সাইকেল স্ট্যান্ড। এ স্ট্যান্ডে আমার চকলেট রঙের হারকিউলিস সাইকেলটাও বিশ্রাম নিয়েছে ওখানে, দিনের পর দিন।
রাস্তাটার অবশ্য মনে থাকার কথা, সাইকেলে ডাবলিং করাও শিখেছিলাম ওরই বুকে। "ব্রেক নাই ডাবলিং পারিনা ব্রেক নাই ডাবলিং পারিনা" করতে করতে চেঁচিয়ে সামনের ভীড় সরিয়ে পতন ঠেকাতে ঠেকাতেই একদিন আবিষ্কার করলাম আরেকজনকে পেছনের ক্যারিয়ারে চাপিয়ে দিব্যি চালিয়ে যাচ্ছি! পেছনে যে থাকতো, ডাবলিং সাইকেলবিদ্যায় আমার কোচ, তারও সাইকেল ছিলো নিজের কিন্তু কিছুদিন পর থেকেই ওটা ওর বাসার পেছনের রুমে ঠাঁই নেয়, আরো কদিন পর হাতবদল হয়ে একদমই চোখের আড়ালে। আমার হারকিউলিসটি অবশ্য আমার অধিকারেই ছিলো, বাসার বারান্দার গ্রিল কেটে চোরবাবাজি নিজের অধিকার বুঝে নেয়ার আগে পর্যন্ত।
এল টির এ বারান্দার দুয়েকটা ঘটনাও মনে করার মত।
ক্লাস একটা শেষ হয়েছে- এর মানে হচ্ছে 'বারান্দায় দাঁড়িয়ে হাওয়া খেতে যাওয়া যাক', এটা কে না জানে? এমনি এক ক্লাসের পর দাঁড়িয়ে আছি, বন্ধুর সাথে চরম আড্ডায় ব্যস্ত, কোন একটা তর্ক চলছে- দুজন মতামত নিয়ে দুই মেরুতে। হঠাত্ করে কাঁধে টোকা পড়লো, "ক্লাসে যাও!" "আমার যখন ইচ্ছা ঢুকবো" বলার জন্য যখন পেছন ফিরেছি তখন দেখি বারান্দায় আর কেউ নাই, পেছনে স্যার দাঁড়িয়ে!
আরেকটা ঘটনা বলি, এটাও মন্দ না।
আমাদের সাথে একজন ছিলো, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাইরে থেকে এসেছে। কোন না কোনভাবে ও খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছে এখানে ভালো ছাত্র কারা, এরপর থেকেই ওদের সাথে ভাব করার চেষ্টা। মজা দেখার জন্যই কিনা কেউ ওকে আমাদের দিকে ঠেলে দিয়েছে। দুয়েকদিন বুঝিয়েছি ঠান্ডা মাথায়, এরপরও দেখি একই ঘটনা। চরম বিরক্ত আমরা।
এমনি একদিন দাঁড়িয়ে আছি, ও এসে হাজির। কী করি কী করি ভাবতেই চোখ পড়লো সামনে, মুশকোমতন এক বন্ধু সদ্য গেট পেরিয়ে কলেজে ঢুকেছে। পাশে দাঁড়ানো বন্ধু তারেকের সাথে এক পলকে ভাবের আদান প্রদান হয়ে গেলো। ও ঘুরে তাকালো যন্ত্রণামানবের দিকে, "এই শোন শোন! এদিকে আয়!" "কি হইছে?"- ও তাকালো তারেকের দিকে। "জানস? তোরে তো আজকে পিটবো?"- ছেলের মুখে চট করে ভয়ের ছাপ পড়লো- "ক্যান ক্যান? কে পিটবো? আমি কী করলাম?" তারেক এবার আঙুল তুলে দেখিয়ে দিলো মুশকোমানবকে- "ক্যান জানিনা, তবে ও তরে পিটবো। ঐ দ্যাখ তোরেই খুঁজতেছে মনে হয়!" এরপর যা হলো তাতে আমরাই অবাক, যন্ত্রণা-মানব গিয়ে মুশকো মানবের উপর, "বাই, আমি কী করছি? আমারে মাইরেন না!" মুশকো-মানব বড়ই ভদ্র মানুষ, কারো সাতেও নেই, পাঁচেও নেই। ও যতই বলে ও কিছুই জানেনা, কিছুই করবেনা ও, যন্ত্রণা ততই ওকে চেপে ধরে। শেষমেষ যন্ত্রণা আমাদের দেখাতে গেলো খবরদাতা হিসাবে, আমরা কি আর আছি নাকি তখন সেখানে?! তবে একটা উপকার পেয়েছিলাম, যন্ত্রণা আর ধারেকাছে আসেনি আমাদের।
এতো এতো কাহিনী যে ক্লাসে ঢোকার সময়ই পাইনি এতক্ষণ। ক্লাসের কাহিনিও হোক দুয়েকটা।
একদম প্রথম দিন। বসে আছি ক্লাসে। শুরু হয়নি তখনো। তিনসারিতে বেঞ্চি সাজানো, ডানের সারিতে মেয়েরা। পুরো ক্লাসভর্তি মানুষ আর মানুষ, পরে কখনোই আর এ দৃশ্য দেখার সৌভাগ্য হয়নি।
যাহোক, ছাত্রসংগঠনগুলো মিছিল করে জ্বালাময়ী শুভেচ্ছা জানিয়ে যাচ্ছে। একদলকে দেখা গেলো ব্যতিক্রম, ওরা শুধু শুভেচ্ছা না, সাথে নিয়ে এলো বোঁটাসহ লাল গোলাপ। কিছুক্ষণ শুভেচ্ছা বিতরণের পর শুরু হলো গোলাপ বিতরণ, সুন্নতি তরিকায়, ডান থেকে। ওমা কী আশ্চর্য, মেয়েদের দেয়া শেষ হতে না হতেই গোলাপও শেষ! তাই বলে ছেলেদের কি বরণ করা হবেনা? তাই কি হয়!? পালা করে ওদের কাছেও পৌঁছে দেয়া হলো -গোলাপের কাঁটাওয়ালা বোঁটা!
ছেলেদের বঞ্চিত করার আরো একটা ঘটনা মনে পড়ছে।
ইংরেজির এক স্যার ছিলেন আমাদের। খুবই অমায়িক, মিহি গলার স্বর। দুদিন ক্লাস না হতেই ঝামেলা নজরে পড়লো সবার, স্যার কেবল ক্লাসের ডানদিকে চড়ে বেড়াতেই পছন্দ করেন। ওদের সাথেই তাঁর কথাবার্তা, হাসাহাসি। ফিসফিস করে কী বলেন, ওরা হেসে কুটিকুটি হয়, আমরা বেকুব হয়ে বসে থাকি। একজন শেষ পর্যন্ত বলেই বসলো, "আপনার কথা কিছুই শুনিনা!" স্যার বললেন, "ইচ্ছে থাকলেই শোনা যায়!" আরো কী একটা বললেন, তাঁর ছাত্রীরা শুনে হেসে অস্থির, আমরা তখন বাতাসে শব্দ খুঁজে বেড়াচ্ছি! স্যার এখন মহিলা কলেজে আছেন, ভালো আছেন নিশ্চয়ই।
কলেজের বাতাসটা বড়ই সুখের, অনেক ঘটনা বাতাসে ভেসে বেড়ায়। ইচ্ছে করলে বলা যায় প্রণব স্যারের বঙ্গভাষা পড়ানোর গল্প, রব্বানী স্যারের হিসাব কাহিনি অথবা শাহেদ স্যারের চাহিদা যোগানের তত্ত্ব। ধর স্যারের শর্টহ্যান্ডের গল্পও করা যায়। যদি ক্লাস থেকে বেরোই তাহলে করা যায় চিটাগাং কলেজ থেকে আগত বাংলা স্যারের অভিনব টিউশন দাওয়াতের গল্প। বলতে হয় আরো দুয়েকজন স্যারের ছাত্রীপ্রীতির কথা কিংবা পিকনিকে গিয়ে ওদের পটানোর চেষ্টা। পিকনিকে কজনের রূপ বদলের গল্প। কলেজের গন্ডি থেকে বেরোলেই ঝটপট জুটে যাবে টিউশনকেন্দ্রীক হরেক স্বাদের কাহিনী। বন্ধুদের আড্ডার ঘটনাগুলো নাহয় ছেড়েই দিলাম।
মজার একটা গল্প দিয়েই শেষ করবো।
ততদিনে ফার্স্ট ইয়ার পেরিয়ে সেকেন্ড ইয়ারে উঠেছি। ক্লাস ফাঁকি দিচ্ছি নিয়মিত। একটা করি তো তিনটা করিনা এই অবস্থা। কলেজ যাওয়া কিন্তু বন্ধ নেই। যাই, আড্ডা দেই, চলে আসি বাসায়। এভাবেই চলছে।
হঠাত্ একদিন কী মনে করে তিন-চারজন মিলে দাঁড়িয়েছি মাত্র বারান্দায়, কোথ্থেকে এক স্যার এসে হাজির-"তোমরা সেকেন্ড ইয়ারের না?" উত্তর দিলাম আমরা, "জ্বি স্যার!" "আসো আসো ক্লাসে আসো। বাইরে কেন? ক্লাস খালি কেন? আর কেউ নাই? ওদেরও ডেকে নিয়ে আসো"- তিনি একবারেই অনেক কথা বলে থামেন। আমরা আর কী করি? মাঠে বারান্দায় আড্ডা দিয়ে বেড়াচ্ছে এমন কজনকে বুঝিয়ে ক্লাসে নিয়ে এলাম। পুরো ক্লাস খালি, বসতে হলো একদম সামনে, স্যার ক্লাস শুরু করলেন।
একটু সময় না পেরোতেই উশখুশ শুরু হলো পাশে বসা তারেকের, "ল যাইগা!" "থাকিনা! ক্ষতি কী?"- ক্লাস পালানোর অভ্যাস না থাকা আমি ফিসফিস করলাম। একটু পরে আবার কানের কাছে আওয়াজ, "ল যাইগা!" আরো বারদুয়েক চললো এমন। এরপর অনেকটা বিরক্ত হয়েই বলতে হলো, "ঠিক আছে, আয় যাই!" কিন্তু প্রশ্ন হলো, কীভাবে? ক্লাস চলছে, একদম স্যারের নাক বরাবর বসা, তেমন বেশী ছাত্র ছাত্রীও নেই যে চোখ এড়িয়ে যাবে, বলতে গেলে উপায়ই নেই কোন।
হঠাত্ স্যার বোর্ডে গেলেন কিছু একটা লিখে বোঝাবেন, আমরা দেখলাম এই সুযোগ! ঝট করে বেঞ্চি থেকে খাতা হাতেই দুই সারির মাঝের পথ দিয়ে দৌড়। স্যার তখনো আমাদের দিকে পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে। আমি পেছনে দরজার কাছে চলে এসেছি তখন হঠাত্ পেছনে খট কড়ড়ড় জাতীয় বিকট আওয়াজ! ফিরে দেখি তারেক ক্লাসের মধ্যখানে দাঁড়িয়ে, বসার একটা বেঞ্চে পা লাগিয়ে অতিকায় শব্দ করে ও সবার দৃষ্টি কেড়েছে। স্যার তখনো অবাক হয়ে তাকিয়ে! হয়তো মনে করার চেষ্টা করছেন তাঁর ঐ ক্লাসে ছাত্র ছাত্রী জোগাড় করার কাজটা এ ক্লাস পালানো দুতিনজনই করেছিলো কিনা?!
চোখে রঙিন চশমা নাকি কলেজে এসেই লাগে। তা না হলেও চশমা লেগেছে চোখে কলেজে এসেই, "ভাব!”-জাতীয় বাঁকা মন্তব্যও কানে এসেছে তখন। সে গল্প তোলা থাকলো পরের কোন সময়ের জন্য। তোলা থাকলো কাছের আরেক বন্ধুকে হঠাত্ শেভ করিয়ে এনে সবার সামনে ফেলে দেয়ার গল্পও। লেখালেখি শুরুর গল্পও রয়ে গেলো পরে বলার জন্য।
সময় অনেক গড়িয়ে গেছে এর মধ্যে। কাজেই বাসায় ফেরাটা জরুরি। বারান্দার সাইকেলস্ট্যান্ড থেকে হারকিউলিসকে মুক্ত করেই ফেরার পথ ধরা যাবে। প্যাডেল চেপে পৌঁছে যাবো গেটের কাছে। পুরোনো অভ্যাসমতো একবার পেছন ফিরেই আবার চলতে শুরু করবো।
হয়তো রেলগেট পেরিয়ে সোজা চলে আসবো বাসার দিকে, হয়তো খেয়ালের বশে ছুটে যাবো নিয়াজ পার্কের দিকে। মিশন হাসপাতালটাকে বাঁয়ে রেখে চলতেই থাকবো, পৌঁছে যাবো সেই জেলা স্টেডিয়াম পর্যন্ত। কাউতুলী থেকে বাইপাসের ঘুরতি পথ হয়েই হয়তো প্যাডেল চালাতে থাকবো, অকারণেই। চেনাজানা পথের গন্ডি পেরিয়ে অচেনাকেই হয়তো চিনে নেবার চেষ্টা করতে থাকবো আবারো।
কিংবা হয়তো কালীবাড়ির মোড় থেকে গোকর্নঘাটের দিকে মোড় ঘুরবো, সূর্যাস্ত দেখতে ছুটবো পৈরতলা রেলগেটের পছন্দের জায়গাটায়। চাই কি চলে যাবো পিয়ারী পুল, দিগন্তজোড়া সবুজ দেখে মন সতেজ করে আসবো। অথবা হয়তো সাহস করে চলে যাবো একদম গোকর্নঘাটেই, তীব্র বাতাস আমাদের উড়িয়ে নিতে চাইবে, পতপত করে উড়বে পরণের কাপড়।
সন্ধ্যা হতে না হতেই বাসায় ফিরে যাবো হয়তো ট্যাংকের পাড়ের নিয়মিত আড্ডা শেষে। পরের দিনের পুরোন রুটিন ঠিকঠাক করে নেবো।
অনেকগুলো সম্ভাবনা থাকবে, কী হবে তা বেছে নেবো নিজের ইচ্ছেতেই, কলেজ জীবন এমনি হয়। এমনি হওয়া উচিত।
আনমনে ঘড়ির দিকে হঠাত্ চোখ পড়তেই হ্যাঁচকা টানে ফিরে আসি বর্তমানে। বাস্তবতা মনে করিয়ে দেয় স্মৃতিবিলাসের অসারতার কথা। ব্যস্ততা ভুলে তবু আরেকবার চলে যেতে ইচ্ছা করে কলেজের করিডোরে, ভালোই তো লাগছিলো ফিরে গিয়ে।
[কৃতজ্ঞতা:
কাছের কজন মানুষকে নানান খুঁটিনাটি জিজ্ঞেস করে বিভ্রান্ত করেছি, ওদের ধন্যবাদ দরকার মত তথ্য যুগিয়ে যাওয়ার জন্য।
বুনোহাঁসের কাছে কৃতজ্ঞতা ব্যস্ততার মাঝেও সময় করে বানান ভুল শুধরে দেয়ায়।
লেখার সময় টের পেলাম, ধরণটা মিলে যাচ্ছে তাসনীম ভাইয়ের 'স্মৃতির শহরে'র সাথে। লেখা থামাতে পারছিলাম না, ভালোও লাগছিল খুব, তাই তাঁর দেখানো পথ ধরেই নিজের স্মৃতিতে ঘুরে এলাম। তিনি এ লেখা পড়বেন কিনা বলা মুশকিল, তবু তাঁর প্রতিও কৃতজ্ঞতা।
আর পাঠক, এত বড় একটা লেখা পড়ার ধৈর্য ধরে রেখেছেন, কৃতজ্ঞতা তাই আপনারও প্রাপ্য।
অনেক ধন্যবাদ সাথে থাকার জন্য।]
No comments:
Post a Comment