Friday, October 15, 2010

মিঁয়াও- পর্ব ৭

খাবার টেবিলের নীচে যে কোনায় সচরাচর দুপুর বা রাতের খাবারের সময় মিঁয়াও-এর দেখা মেলে ক'দিন হল সে জায়গাটা খালিই থাকছে।

খাবার সময় হলে ওর ছোট প্লেটটায় ওর জন্য লোভনীয় সব খাবার দিয়ে দেওয়া হয়, হাড় কাঁটাগুলো ডেজার্ট হিসাবে ঝোলভাতে মাখা হয়ে পৌঁছে যায় জায়গামত, এমন কি ওই প্লেট খালিও হয় রুটিন করেই, মিঁয়াও-এর দেখাই মেলেনা কেবল।

এমন না যে মিঁয়াও হারিয়ে গেছে কি পালিয়ে গেছে কি নতুন কোন বেড়াল এসে ওর জায়গা দখল করেছে- তবে ওকে দেখা যায়না তেমন এটা ঠিক।

অবশ্য কেউ যদি ভাল করে খুঁজে দেখেন তাহলে টেবিলের পেছনে যে ফ্রিজটা আছে তার কাঠের পাটাতনের নীচ থেকে বেরিয়ে আসা মোলায়েম ঝাঁকির সাথে নড়তে থাকা কমলা সাদা ল্যাজটা নজর এড়ানোর কথা না- ল্যাজ টানলে মাথা বেরোতে আর কতক্ষণ?!

মিঁয়াও নিজেই বেছে নিয়েছে এ নতুন জায়গা, ইদানীং সবার চোখ এড়িয়ে চলাটাই নিরাপদ মনে হচ্ছে। কারো কারো সামনে পড়ে গেলে রীতিমত শরমেই পড়তে হয়, কি যে বিপদ!

অবাক হয়ে থাকা বড় বড় চোখ না হয় ভুলে যাওয়া চলে, কিন্তু ঠোঁটের কোনায় ঐ হাসি কি সহ্য করা যায় না করা সম্ভব?! অন্যের কষ্ট তো খানিক বুঝতে হয়, না কি? তা যখন হচ্ছেনা এরচে.. "তোরা বাবা তোদের মতে থাক, আমাকে তোদের দেখা লাগবেনা, আমিও তোদের সামনে পড়বো না!"- মিঁয়াও নিজেই সমাধান খুঁজে নিয়েছে।

আর কষ্টের তো শেষ নাই কোন, এত যে পছন্দ করে ওকে নিতুনবাবু আর ওর আম্মু, ওরা পর্যন্ত মুচকি হাসি দিতে ছাড়েনি, চোখ চকচক করে উঠেছে একদম।

আর নিতুনের বাবা, ঐ হতচ্ছাড়া হোঁদল কুতকুত, তার হাসি তো থামেই না! মিঁয়াও-এর দিকে তাকিয়ে একচোট হাসে, এরপর চশমাটা খুলে চোখ মুছে ফের খ্যাক খ্যাক করতে থাকে।

এতেই কি শেষ?! বাসায় মেহমান ছিল একজন, কি হয় জানি ওদের, গিয়ে ডেকে এনেছে, "ওরে দেখে যাও না একবার, ওইটারে নিজের চোখে দেইখা যাও, এমন আর একটাও নাই!"- এরপর আবার খিক খিক! এরপরও যদি মেজাজ না চড়ে আর কথন চড়বে?

সেই থেকে মিঁয়াও আড়ালে পালিয়েছে, আছে আশেপাশেই, কালেভদ্রে সাদা ঝলকও দেখিয়ে দিয়ে যায়- কিন্তু চোখের সামনে আর পারতপক্ষে পড়েনা! মুখে বলেনা কিছু কিন্তু কেউ হাত বাড়িয়ে ধরতে গেলে ঠিকি গররর করে জানিয়ে দেয়-"এখন এত দরদ ক্যান? তখন তো ঠিকই...!" মাঝে মাঝে মনে হয় বাড়ানো হাতটায় খামচি দেয়, আবার ভাবে, "এটা একটু বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে.."; অতি কষ্টে নিজেকে সামলে নেয় তখন।

ঘটনা কিন্তু একদমই সাধারণ, এটাকে এমন গুরুত্ব দেবার কি আছে সেটাই বরং প্রশ্ন।

মিঁয়াও আগে দেখেছে, তবে অত খেয়াল করেনি- নিতুনদের বাসার যে রান্নাঘর তার পাশেই আরেকটা ছোট রুম আছে, ওটার নাম স্টোর রুম। ঐ রুমে সে ঢুকেছেও- একদম জঞ্জালের কারখানা, বাসার যত জঞ্জাল সব ঐখানে জমা করা, হাতল ছাড়া ভাঙ্গা চেয়ার থেকে শুরু করে পুরানো বড় বালতি, অকেজো খেলনা, সব। অন্ধকার রুম, দরজা খোলায় যতটুকু আলো আসে তাতে পাতলা জালে ভাসতে থাকা আটপেয়ে এক বিকট মাকড়শা দেখা যায়, মনে হয় ড্যাবড্যাব কয়ে তাকিয়ে আছে। দেখেই বুকের কলিজা ঠান্ডা হয়ে আসে! এ রুম সব সময় বন্ধ থাকলেও মাঝে মাঝে খোলা হয়, বড় বড় ড্রাম আছে দুইটা- নীল রংয়ের, ভাত রান্নার চাল থাকে ওখানে, ছোট পাতলা ঢাকনিটা সরিয়ে ছোট কৌটায় করে চাল বের করে আরেকটা বড় কৌটায় রাখেন নিতুনের আম্মু- সাদা রংয়ের, ওটা থাকে রান্নাঘরে- একদম হাতের নাগালে, মিঁয়াও সেটাও জানে।

সেদিন মিঁয়াও বসে ছিল রান্না ঘরেই, বড় একটা মাছ কাটাকাটি চলছে, আঁশটে গন্ধ, গুটলী পাকিয়ে শুয়ে থাকার জন্য নেহায়েত খারাপ পরিবেশ না। হঠাত্‍ করে নিতুনের আম্মু সাদা কৌটাটুকু টেনে নিলেন, ঢাকনা খুলে একবার ভেতরে তাকিয়েই ওটাকে হাতে নিয়ে চলে গেলেন স্টোর রুমের দিকেই। দরজার কাছেই মিঁয়াও শুয়ে, স্টোর রুমের দরজা তার চোখ বরাবর সোজা, নীল রংয়ের ড্রামদুটোও একদম সামনেই। নিতুনের আম্মু সোজা গিয়েই ড্রামের ঢাকনা খুললেন, তাকালেন ভেতরে, এরপর চট করে আবার বন্ধ করে দিলেন ঢাকনাটা। ঘাড় উঁচিয়ে বোঝার চেষ্টা করল মিঁয়াও, অল্প সময়ের জন্য হলেও নিতুনের আম্মুর আঁতকে ওঠা চোখ এড়ায়নি তার, ডানকানটা একদম টানটান করেও বাড়তি কোন শব্দও কানে এলোনা।এরপর নিতুনের আম্মু ফিরে তাকালেন, ওর দিকেই, কপাল একটু কুঁচকে আছে কিন্তু মুখে হাসির রেখা। মিঁয়াও আশ্বস্ত হল, "তাহলে ঝামেলা হয়নি কোন।"

উনি বেরিয়ে এলেন ঐ রুম থেকে, মিঁয়াও-এর চোখে চোখ পড়ল বার দুয়েক। পায়ে পায়ে কাছে এসে কোলে তুলে নিলেন আলতো করে, ফিসফিস করে বলা কথা কানে এলো মিঁয়াও-এর, "হুম, তোকেই দরকার!"

ওকে কোলে করেই নিতুনের আম্মু আবার চলে এলেন ঐ ড্রামটার কাছে, মিঁয়াও-এর চোখ কেন জানি চলে গেল রুমের একদম কোনে, বিচ্ছিরি মাকরশাটা ঠিক ঠিক বসে আছে ওখানে, যথারীতি ড্যাবড্যাবিয়ে তাকিয়ে। মিঁয়াও-এর বিরক্তিই আসে মনে, "আরে ব্যাটা এত কি দেখিস! চোখ বরাবর থাবা মারা উচিত একদম!"

হঠাত্‍ করেই ও টের পেলো ওকে ধরা হাতদুটো আস্তে আস্তে নীচে নামছে। লাফিয়ে ওঠার চেষ্টা করলো একবার, খামচে ধরার চেষ্টা করলো নিতুনের আম্মুর শাড়ি। লাভ হল না, ততক্ষণে ল্যাজসহ অর্ধেক শরীর ঐ ড্রামের খুলে রাখা মুখ গলে ভেতরে ঢুকে গেছে, থাবা পড়ল গিয়ে ড্রামের মুখটায়, বেরিয়ে আসা নখের আঁচড় দাগ বসিয়ে দিল ওখানে, কিচচচ শব্দে গোটা শরীর শিউরে উঠল একদম। "এ কি রে বাবা, আটকে দেবে নাকি?"- মিঁয়াও না ভেবে পারল না, মাঝে মাঝে দূর্ঘটনা ঘটিয়ে বসলে এ টাইপের শাস্তি পেতে হয়- কিন্তু ইদানীং কোন আকাজ তো সে করেনি!

পুরো শরীরের ভারটা নিয়ে ওর পা গিয়ে ঠেকল ভেতরে রাখা চালের উপর, নরম বটে একটু একটু কিন্তু সরে যায়না। ড্রামের খোলা মুখ দিয়ে উপরে তাকিয়ে নিতুনের আম্মুর হাসিমুখ দেখে মিঁয়াও শান্তি পেলো, আটকে দেবেনা অন্ততঃ! এবার ভেতরে তাকানোর ফুরসত মিলল তার, ড্রামের অর্ধেকটা খালি, পরিস্কার দেখা যায়না কিছু, চোখ ধাতস্থ হয়ে ওঠেনি তখনো।

এর মধ্যেই কিছু একটাকে ছুটে আসতে দেখল ওর দিকে, ছোট, কুঁতকুঁতে চোখ, ছাই আর সাদার একটা ঝলক লাগল একবার, চিকন চাকন গোলাপি আভার ল্যাজটা যেন চট করে একটা ঝাপটা দিল বাম থেকে ডানে! ছোট ছোট সাদা দাঁতও নজর এড়ালো না তার। কি হল বলা মুশকিল, মিঁয়াও-এর সমস্ত শরীর কাঁটা দিয়ে উঠলো, ধরাস ধরাস করতে থাকা বুকটা সামলে ডাক ছেড়ে বলতে চাইল, "মা গো!", একলাফে বেরিয়ে এল ড্রামের খোলা মুখ গলে! তিনলাফে রান্নাঘর ছেড়ে পালানোর আগে একবার ফিরে তাকাল শুধু, নিতুনের আম্মু চোখ গোল গোল করে ওর দিকে তাকিয়ে; "হুহ, আর যাচ্ছিনা ওখানে!" -ঘাড় ফিরিয়ে পালালো মিঁয়াও।

ওর ধারণা ছিল ঘটনার ওখানেই শেষ, দুপুরের খাবারের সময় টের পাওয়া গেল ওর ধারণা ভুল, ঘটনা কেবল শুরু হয়েছে! টেবিলে রাখা ফোনটা কানে নিয়ে নিতুনের আম্মু কাকে যেন বলতে শুরু করল, "জানো না তো আজ কি হয়েছে-", মেজাজ খারাপ হল মিঁয়াও-এর, এই মানুষটার সব ভাল কেবল একটাই সমস্যা- কোন কথা বলতে হবে আর কোনটা বলতে হবে না এটা সব সময় বোঝেনা, মিঁয়াও আগেও এটা দেখেছে। "কবে যে এরা একটু বুঝতে শিখবে!"- খিঁচড়ে যাওয়া মেজাজ নিয়েই ও আফসোস করে।

"তবে আর কি? সাক্ষাত্‍ ইঁদুর, ওটাকে দেখেই দে ম্যাওওও করে দে লাফ-" নিতুনের আম্মুর হড়বড় করে বলা কথাগুলোর মধ্যে এটুকুই কেবল ভনভন করতে থাকা কানে এসে পৌঁছে মিঁয়াও-এর। "ইঁদুর?! ওটা ইঁদুর!?"- লজ্জায় এবার সে কুঁকড়ে গেল একদম-

ও তখনো বুঝতে পারছেনা ও কেন লাফিয়ে পালালো তখন- "পালাবে তো ঐ হতচ্ছাড়া!"

এরপর আর কী? হোঁদল কুতকুত বাসায় এসেই প্রথম প্রশ্ন করল, "কই হে! তোমার ইন্দুর কই!?"

সেই থেকে চলছেই। প্রথম ক'দিন একটু লজ্জাতেই ছিল মিঁয়াও, "আমি বিড়াল নামের কলঙ্ক!" এরপর অভিমান এসে ভর করলো- "একটা ঘটনা না হয় ঘটেই গেছে- এটাকে নিয়ে এত নাড়াচাড়ার কি আছে?!" আর তারও ক'দিন পর থেকে রাগ- "আমার চেহারাই দেখতে হবেনা আর!"

সবাই অন্য কোথায় থাকলেই কেবল ফ্রিজের নীচের অন্ধকার আস্তানা থেকে বের হয় মিঁয়াও, একটু ঘুরে বেড়ায় কি সুযোগ থাকলে উঠে বসে আলমারির ওপর ওর আগের জায়গায়, কেবল বোঝার চেষ্টা করে এ ঝামেলা মিটবে কবে।

"ওরা কি তবে কিছুই ভুলবে না?"- নিজের নতুন পাওয়া 'ইন্দুর' উপাধি নিয়ে চিন্তিত মিঁয়াও সাবধানে আরো একটু ভেতরের দিকে সরে আসে, চিন্তাতেই হোক আর অভ্যাসেই হোক, শরীরটা গুঁটলী পাকিয়ে বসতেই আপনাতেই চোখ বন্ধ হয়ে ওর।

সর্বনাশা শান্তির ঘুম, রেহাই নাই এর হাত থেকেও!

1 comment:

  1. Ekhane bangla kivabe likhte hoy janina. tai evabei.
    Amader Khatas er kotha mone pore gelo. becharao edur dekhe evabei palato. amra bosso boltam or olosota. O sit kale chulor kache mukhr rekhe bose thakto emono hoyeche j se tar gof porjonto purie feleche tobuo oi jaiga chere noreni.
    Great mormo.
    miao er ghar chulke dilam.

    ReplyDelete